হোয়াইট হাউস পোস্টে এআই কার্টুন: বিতর্ক ও প্রযুক্তি নীতিশাস্ত্র
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের এক্স অ্যাকাউন্ট একটি পোস্ট শেয়ার করে। পোস্টটিতে একজন আটককৃত ব্যক্তির ছবি ছিল। হোয়াইট হাউস জানায় ব্যক্তিটি ফেন্টানাইল পাচারকারী এবং অবৈধ অভিবাসী। ছবির সাথে একটি কার্টুনও যুক্ত করা হয়। কার্টুনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে মনে করা হচ্ছে।
কার্টুনটিতে দেখা যায় একজন নারী কাঁদছেন। একজন অফিসার তাকে হাতকড়া পরাচ্ছেন। কার্টুনটির শৈলী বেশ পরিচিত। এটি ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি নির্মিত ছবির মতো। বিশেষত, স্টুডিও জিবলির অনুকরণে তৈরি ছবিগুলির সাথে এর মিল রয়েছে। এই স্টাইলটি সম্প্রতি ইন্টারনেটে খুব জনপ্রিয় হয়েছে। হোয়াইট হাউস নির্দিষ্ট কোনো এআই টুলের নাম উল্লেখ করেনি। তবে ছবির ধরন দেখে সবাই চ্যাটজিপিটির (ghibli edit)কথাই ভাবছে।
প্রযুক্তি বিশ্বে ও নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা

এই ঘটনা প্রযুক্তি বিশ্বে এবং নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে এআই টুলের এমন ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বিষয়টিকে নিছক একটি সফটওয়্যার টুলের ব্যবহার মনে করছেন। তবে কেউ কেউ এর মধ্যে গভীর সমস্যা দেখছেন। একটি সরকারি সংস্থা কেন এমন বিতর্কিত ছবি ব্যবহার করবে? এই প্রশ্ন উঠছে বারবার।
ওপেনএআই এবং হোয়াইট হাউসের কাছে এই বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হয়েছে। ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান এই জিবলি-স্টাইল ছবিগুলিকে প্রচার করেছেন। তিনি এগুলোকে চ্যাটজিপিটির পেইড সংস্করণের আকর্ষণীয় ফিচার বলেছেন। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওপেনএআই-এর বিভিন্ন প্রকল্পের সমর্থক। তিনি অল্টম্যানের সাথে একটি সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন এবং সিলিকন ভ্যালির মধ্যে সম্পর্ক বেশ জটিল। ghibli edit
কার্টুনের উদ্দেশ্য: কঠোর অভিবাসন নীতি নাকি নিষ্ঠুরতা?
এই কার্টুনটির উদ্দেশ্য নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ বলছেন, এটি প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রচার। অনেকে এর মধ্যে এক ধরনের অনলাইন নিষ্ঠুরতা দেখছেন। তবে ছবির জিবলি স্টাইল বিষয়টিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। জিবলির অ্যানিমেশন তার মানবিক আবেদন ও সহানুভূতির জন্য বিখ্যাত। তাই অনেকে মনে করছেন, কান্নারত নারীর কার্টুন মানুষের সহানুভূতি তার দিকেই টানবে। এটি হয়তো প্রশাসনের উদ্দেশ্যের বিপরীত ফল দেবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ও মিডিয়া এখন বেশ প্রচলিত। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এর ব্যবহার বাড়ছে। ট্রাম্প সমর্থকরা আগেও এআই বা ফটোশপ করা ছবি ব্যবহার করেছেন। তারা প্রায়ই ট্রাম্পকে অতিমানবীয় রূপে চিত্রিত করেন। প্রযুক্তি এবং রাজনীতির এই মেলবন্ধন নতুন কিছু নয়। ইলোন মাস্ক (এক্সএআই প্রতিষ্ঠাতা) এবং ডেভিড স্যাক্স (‘এআই জার’) এর মতো ব্যক্তিরা ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে যুক্ত।
এই ঘটনায় ওপেনএআই-এর অবস্থান কী, তা স্পষ্ট নয়। কোম্পানিটি তাদের ইমেজ জেনারেটরের নমনীয় নীতিমালার কথা বলে। তারা হয়তো বলবে, এটি ফটোশপের আপত্তিকর ব্যবহারের মতোই। টুল ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ওপেনএআই কি এই ধরনের ব্যবহার সমর্থন করে? তাদের কোম্পানির ঘোষিত মূল্যবোধের সাথে কি এটি সঙ্গতিপূর্ণ? আট বছর আগে হয়তো কোনো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এমন ব্যবহারে আপত্তি জানাতো। তারা নিজেদের প্রেসিডেন্টের নীতি থেকে দূরে রাখত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
রাজনীতিতে এআই-এর ব্যবহার: নতুন প্রবণতা
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। ওপেনএআই হয়তো সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তাই তারা হয়তো কোনো সমালোচনা করবে না। এই ঘটনা সিলিকন ভ্যালির সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
জিবলি ফিল্টার ব্যবহারের নৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। স্টুডিও জিবলির প্রতিষ্ঠাতা হায়াও মিয়াজাকি এআই শিল্পের ঘোর বিরোধী। তিনি এআই অ্যানিমেশনকে ‘জীবনের প্রতি অপমান’ বলেছেন। তার অনুমতি ছাড়াই তার শৈলী অনুকরণ করা হচ্ছে। ওপেনএআই এই শৈলী ব্যবহার করে গ্রাহক টানছে। লেখক ব্রায়ান মার্চেন্ট এটিকে একটি ‘ক্ষমতার খেলা’ বলেছেন। এটি শিল্পীদের প্রতি এক ধরনের অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেন বলছে, ‘আমরা যা চাই তাই নেব’।
সমসাময়িক প্রযুক্তি ও রাজনীতির মধ্যে একটি মিল দেখা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই শক্তি, অর্থ ও ক্ষমতার প্রয়োগ প্রধান। অন্যের মতামত বা অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, ব্যবহারকারীর প্রয়োজন ছাড়াই নতুন ফিচার চালু করা হয়। একে ‘প্রযুক্তির অনিবার্যতা’ বলে চালানো হয়। সমালোচকদের কথা শোনা হয় না। সহানুভূতি বা আপসকে দুর্বলতা মনে করা হয়।
যদিও জিবলি(Ghibli edit) ফিল্টারটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। মানুষ এটি দিয়ে সুন্দর ছবি তৈরি করছে। কিন্তু শিল্পীদের সম্মান না দেখিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। ওপেনএআই পারতো শিল্পীদের সাথে অংশীদারিত্ব করতে। তারা কম পরিচিত শিল্পীদের শৈলী ব্যবহার করতে পারতো। এতে নতুন প্রতিভারাও পরিচিতি পেত। কিন্তু সেটি করা হয়নি। এটি ক্ষমতাবানদের মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়।
এই ঘটনা আমাদের অনেকগুলো প্রশ্ন ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কোথায় নৈতিকতার সীমারেখা টানব? প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের শক্তিশালী টুলগুলির ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে? ওপেনএআই কি মনে করে এই ব্যবহার ‘সকলের জন্য এআই’-এর লক্ষ্য পূরণ করে? সব প্রযুক্তি কোম্পানিকেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। তাদের ঠিক করতে হবে, তারা কোথায় তাদের নৈতিক সীমারেখা টানবে। জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা কী হবে? এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও বাড়বে।
news source: Verge
For tech related news updates, visit our website.